পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই উষ্ণতা বৃদ্ধি যদি ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস অতিক্রম করে, তবে কোভিড-১৯ এর চেয়েও ভয়াবহ নতুন মহামারী দেখা দিতে পারে বলে আশঙ্কা করেছেন মেলবোর্ন, অস্ট্রেলিয়াভিত্তিক লোটাস এনার্জি রিসাইকেলিংয়ের প্রধান বৈজ্ঞানিক ডঃ মোঃ মোখলেছুর রহমান।
তিনি তার পাঠানো এক ইমেইল বার্তায় জানান, যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ওশেনিক অ্যান্ড অ্যাটমোসফেরিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (NOAA)–এর গবেষণা অনুযায়ী ১৯০০ সাল থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা (প্রাক-শিল্পযুগের তুলনায়-১৮৫০-১৯০০ সাল) প্রায় ১.৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে । এর বড় অংশই বেড়েছে গত এক দশকে (২০১৫-২০২৪) ।
প্রশ্ন হলো কেন বাড়ছে তাপমাত্রা? ড. মোঃ মোখলেছুর রহমান ও অন্যান্য বৈজ্ঞানিকদের মতে, শিল্পায়ন, জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানো, বিদ্যুৎকেন্দ্র, যানবাহন, কৃষি ও গবাদিপশুর খামার থেকে নির্গত গ্রীনহাউস গ্যাস বিশেষ করে কার্বন ডাই-অক্সাইড, মিথেন ও নাইট্রাস অক্সাইড বায়ুমণ্ডলে জমা হচ্ছে । বন উজাড় এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে। এই সকল গ্রীনহাউস গ্যাস অনুগুলো ভূপৃষ্ঠ থেকে ফিরে যাওয়া সূর্যের তাপকে (ইনফারারেড রেডিয়েশন) আটকে রাখে এবং পরবর্তীতে চারিদিকে নিঃসরণ করে। যার ফলে ভূপৃষ্ঠের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেতে থাকে। বায়ুমণ্ডলে গ্রীনহাউস গ্যাসের ঘনত্ব বা মাত্রা যতো বেশী হবে ভূপৃষ্ঠ ততো বেশী উত্তপ্ত হবে।
তাপমাত্রা বৃদ্ধি ১.৫ ডিগ্রি পার হলে কী হবে? আবহাওয়া ও পরিবেশ বৈজ্ঞানিকদের মতে, পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধি ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের উপরে গেলে হিমালয় পর্বত অঞ্চলের প্রায় ৫০% বরফ এবং আর্কটিক অঞ্চলের অর্ধেকর বেশী গ্ল্যাসিয়ের ও পার্মাফ্রোস্ট গলে পানি হয়ে বিলীন হয়ে যেতে পারে।
এই ক্ষেত্রে ড. মোঃ মোখলেছুর রহমান ১৯১৫ সালের প্যারিস ক্লাইমেট চুক্তির কথা স্মরণ করিয়ে বলেন,১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রাকে ক্রিটিকাল তাপমাত্রা যেটাকে টিপিং পয়েন্ট (tipping point) হিসাবে বিবেচিত করা হয়েছে। অর্থাৎ পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধি ১.৫ ডিগ্রী সেলসিয়াস অতিক্রম করলে আবহাওয়ার যে ভয়ঙ্কর একটা পরিবর্তন হবে সেখান থেকে পৃথিবীর আবহাওয়া আর স্বাবাবিক অবস্থাই ফিরে আসবেনা (point of no return)। যার ফলে প্রতিনিয়ত ভয়ঙ্কর হিট ওয়েভস, খরা, এবং বন্যা দেখা যাবে ।
মহামারীর ঝুঁকি কেন? ড. মোঃ মোখলেছুর রহমান বলেন, অতি প্রাচীন ব্যাকটেরিয়া ও ভাইরাস যে গুলো হাজার-হাজার কিংবা মিলিয়ন বছর ধরে গ্ল্যাসিয়ের এবং পার্মাফ্রোস্ট বরফের মধ্যে মৃত্যু জীবজন্তর শরীরে জীবন্ত অবস্থায় আছে। বরফ গললে এসব জীবাণু বাতাস ও পানির মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে। এই সুপার বাগ ব্যাকটেরিয়াকে দমন করবার মতো কোনো এন্টিবায়োটিক নেই এবং এরা এন্টিবায়োটিক রেসিস্ট্যান্ট।
সবচেয়ে দুশ্চিন্তার কারণ হলো যে, এই সমস্ত অতি প্রাচীন ভাইরাসের বায়োলজিক্যাল ধর্ম বা গুনাগুন সম্পর্কে বৈজ্ঞানিকদের তেমন কোনো গবেষণা নাই। ফলে অতি দ্রুত ভ্যাকসিন আবিষ্কারের সম্ভবনা খুবই ক্ষীন হবে। ভ্যাকসিনের অভাবে মৃত্যুর মহামারী তৈরী হতে পারে বলে ড. মোঃ মুখলেসুর রহমান রহমান মনে করেন।
উত্তরণের পথ কী? ড. মোঃ মোখলেছুর রহমান কার্বন (C) মুক্ত জ্বালানী ও রিনিউয়েবল এনার্জিকে উত্তরণের একমাত্র পথ বলে উল্লেখ করেন। উদাহরণ হিসাবে তিনি পারমাণবিক শক্তি প্রযুক্তি (ইউরেনিয়াম জ্বালানি), সৌর শক্তি প্রযুক্তি (সূর্যের আলো), বায়ু শক্তি প্রযুক্তি (বাতাস), বায়োএনার্জি বা জৈব জ্বালানি (জৈববস্তুপুঞ্জ), জলবিদ্যুৎ প্রযুক্তি (বাঁধের পানি), ভূতাপীয় শক্তি (ভূ-অভ্যন্তরের তাপ), হাইড্রোজেন শক্তি প্রযুক্তি (ফুয়েল সেল), ইলেকট্রিক ভেহিকেল (ব্যাটারি প্রযুক্তি) এবং ব্যাটারি স্টোরেজ সিস্টেম (বিদ্যুৎ জমিয়ে রাখার প্রযুক্তি) উল্লেখ করেন।
তিনি বিশেষ ভাবে মনে করেন যে, কার্বন মুক্ত জ্বালানীর সুবিধা পেতে হলে যেটি সবচেয়ে বেশী প্রয়োজন তা হলো ব্যাটারি প্রযুক্তির যানবাহন (কম্বাসশন ইঞ্জিনকে রিপ্লেস করে সম্পূর্ণ ব্যাটারী চালিত ইলেকট্রিক যানবাহন) এবং স্মার্ট ব্যাটারি স্টোরেজ সিস্টেম, যা ক্লিন এনার্জিকে স্টোর করে প্রয়োজন মতো যে কোনো সময়ে ইলেকট্রিক গ্রিডে সরবরাহ করতে পারা।
এই চাহিদা পূরণের জন্য বর্তমানের বাণিজ্যিক লিথিয়াম আয়ন ব্যাটারী উপযোগী নয়। তিনি ব্যাখ্যা করে বলেন-বর্তমানের লিথিয়াম আয়ন ব্যাটারী ব্যায়বহুল এবং নেগেটিভ ইলেক্ট্রোড হলো কার্বন (গ্রাফাইট) মেটেরিয়াল যার এনার্জি ক্যাপাসিটি খুব কম (৩৭২ মিলিঅ্যাম্পিয়ার-ঘণ্টা প্রতি গ্রাম-mAh/g) এবং ব্যাটারী ফুল চার্জ হতে অনেক সময় লাগে (লো রেট ক্যাপাবিলিটি)।
তাই গ্রাফাইটের পরিবর্তে স্মার্ট ন্যানো মেটেরিয়ালের নেগেটিভ ইলেক্ট্রোড দরকার। এনার্জি ম্যাটেরিয়ালস বৈজ্ঞানিকরা ন্যানো সিলিকনকে সবচেয়ে শক্তিশালী নেগেটিভ ইলেক্ট্রোড হিসাবে চিন্নিত করেছে, কারন এর ক্যাপাসিটি গ্রাফাইটের তুলনাই ১০ গুন বেশী (৪২০০ মিলিঅ্যাম্পিয়ার-ঘণ্টা প্রতি গ্রাম-mAh/g) এবং উচ্চ রেট ক্যাপাবিলিটি অর্থাৎ ব্যাটারী ফুল চার্জ হতে খুব কম সময় লাগবে।
বলে রাখা ভালো ড. মোঃ মোখলেছুর রহমান ও তার টিম প্রায় গত দশ বছর ধরে ন্যানো সিলিকন নেগেটিভ ইলেক্ট্রোড ডেভেলপমেন্টের গবেষণা করে আসছে এবং দারুন সফলতাও পেয়েছে। তাছাড়া কৃষিতে হাইড্রোপনিক্স চাষ এবং গবাদিপশুর খাবারে আধুনিক ফিড অ্যাডিটিভ (অস্পরাগোপসিস এবং ৩-নাইট্রোঅক্সিপোপানল) নাইট্রাস অক্সাইড ও মিথেন কমাতে সাহায্য করে । এ ক্ষেত্রে তিনি অস্ট্রেলিয়া সহ বিভিন্ন দেশের গবেষণার ফলাফল উল্লেখ করেন।
সর্বোপরি পৃথিবীর প্রতিটি দেশের বাৎসরিক বাজেটে কার্বন কাট করার জন্য বিশেষ বরাদ্ধ রাখতে হবে যা গবেষণা ও ক্লিন এনার্জি উৎপাদন এবং স্টোরেজ প্রযুক্তিতে খরচ করতে হবে। তাছাড়া চলমান প্রক্রিয়া হিসাবে বেশী বেশী করে বৃক্ষ রোপনতো করতেই হবে।
ড. মোখলেছুর রহমান বলেন, “এখনই পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বড় মূল্য দিতে হবে। জলবায়ু সুরক্ষা শুধু পরিবেশ নয়, মানবজাতির অস্তিত্বের প্রশ্ন।” বিশেষজ্ঞরা সবাইকে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন আর ভবিষ্যতের সমস্যা নয়-এটি এখনই বৈশ্বিক সংকট।