দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অন্যতম প্রধান উৎস হিসেবে দ্রুত বিস্তৃত হচ্ছে সৌরবিদ্যুৎ। বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলা ও আমদানিনির্ভর জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমাতে সরকার এ খাতের ওপর জোর দিচ্ছে। তবে সৌরবিদ্যুতের এই দ্রুত প্রসারের আড়ালে তৈরি হচ্ছে এক বড় পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ- মেয়াদোত্তীর্ণ সোলার প্যানেলের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা।
বর্তমানে দেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি মিশ্রণে সৌরবিদ্যুৎ প্রায় ১,২৬৫ মেগাওয়াট সক্ষমতা নিয়ে শীর্ষে রয়েছে, যেখানে বার্ষিক চক্রবৃদ্ধি প্রবৃদ্ধির হার (CAGR) ৩৮.৬ শতাংশ। সরকারের ‘জাতীয় নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কৌশল-২০২৬’ অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুৎ চাহিদার ২০ শতাংশ এবং ২০ ৪০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে পূরণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
সামনে সোলার প্যানেলে বর্জ্যের বিশাল পাহাড়ঃ
সাধারণত একটি সোলার প্যানেল ১০ থেকে ১৫ বছর কার্যকর থাকে। মেয়াদ শেষে এসব প্যানেল যত্রতত্র বা ল্যান্ডফিলে ফেলা হলে তা গুরুতর পরিবেশ বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
যুক্তরাজ্যের নটিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২৬ সালের এক গবেষণা অনুযায়ী, ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশে সোলার প্যানেল বর্জ্যের পরিমাণ দাঁড়াবে প্রায় ২৮ হাজার ২০০ টন থেকে সর্বোচ্চ ৭ লাখ ৭০ হাজার টন (০.৭৭ মিলিয়ন টন)। এত বিশাল পরিমাণ বর্জ্য সামলানোর মতো উপযুক্ত অবকাঠামো দেশে এখনো গড়ে ওঠেনি।
মাটিতে মিশতে পারে বিষাক্ত উপাদানঃ
একটি ক্রিস্টালাইন সিলিকন সোলার প্যানেলে প্রধানত ৭৫% টেম্পার্ড গ্লাস, ১০% পলিমার, ৮% অ্যালুমিনিয়াম, ৫% সিলিকন এবং ২% অন্যান্য ধাতু থাকে। এর পাশাপাশি সিসা, ক্যাডমিয়াম, সেলেনিয়াম, ফসফরাস ও বেরিয়ামের মতো ক্ষতিকর উপাদানও থাকতে পারে।
যথাযথ ব্যবস্থাপনা ছাড়া এসব প্যানেল ফেলে রাখা হলে ক্ষতিকর রাসায়নিক মাটি ও ভূগর্ভস্থ পানিতে মিশে মানুষ, জীববৈচিত্র্য ও গবাদিপশুর স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি তৈরি করবে।
‘বর্জ্য থেকে সম্পদ’: প্রবাসী বাংলাদেশি বিজ্ঞানীর প্রযুক্তি ভাবনাঃ
এই বৈশ্বিক ও জাতীয় সংকট মোকাবিলায় কার্যকর সমাধান হতে পারে আধুনিক রিসাইক্লিং পদ্ধতি। মেধা ও গবেষণার শক্তিতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের নাম উজ্জ্বল করেছেন বাংলাদেশি প্রবাসী বিজ্ঞানী ড. মো. মোখলেছুর রহমান। তিনি বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নভিত্তিক বিখ্যাত প্রতিষ্ঠান ‘লোটাস এনার্জি রিসাইক্লিং’-এর প্রধান বৈজ্ঞানিক এবং গবেষণা ও উন্নয়ন (R&D) বিভাগের প্রধান হিসেবে কর্মরত রয়েছেন।
ড. মোখলেছুর রহমান মেইলে পাঠানো বার্তায় জানান, তাদের বিশেষায়িত প্রযুক্তির মাধ্যমে কোনো দূষণ ছাড়াই সোলার প্যানেলের প্রায় ৯৯ শতাংশ উপাদান পুনর্ব্যবহার করা সম্ভব:
প্যানেল থেকে সংগৃহীত অ্যালুমিনিয়াম, তামা ও প্লাস্টিক পেলেট আকারে আন্তর্জাতিক বাজারে বিক্রি করা হচ্ছে।
চূর্ণ করা টেম্পার্ড গ্লাস রাস্তার ভিত্তি ও অবকাঠামো নির্মাণে ব্যবহৃত হচ্ছে।
উচ্চ বিশুদ্ধতার ন্যানো-সিলিকন ও রুপা পৃথক করে তা নতুন সোলার প্যানেল, ইভি ব্যাটারি, সিলিকন চিপ ও বায়োমেডিসিন খাতে ব্যবহারের পথ সুগম হয়েছে।
জার্মানি, জাপান ও ভারতের মতো দেশগুলো ইতোমধ্যে এই বাংলাদেশি বিজ্ঞানীর উদ্ভাবিত ও পরিচালিত প্রযুক্তি ব্যবহারে আগ্রহ দেখিয়েছে।
বাংলাদেশের জন্য এখনই প্রস্তুতির সময়ঃ
আগামী দুই থেকে তিন দশকের মধ্যে বাংলাদেশে লাখ লাখ সোলার প্যানেল মেয়াদোত্তীর্ণ হতে যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা এখনই নিম্নোক্ত পদক্ষেপগুলো নেওয়ার তাগিদ দিচ্ছেন:
নীতিমালা প্রণয়ন: সোলার বর্জ্য সংগ্রহ, পরিবহন ও রিসাইক্লিংয়ের জন্য সুনির্দিষ্ট ই-বর্জ্য নীতিমালা তৈরি।
জাতীয় ডাটাবেজ: দেশে ব্যবহৃত প্যানেলের পরিমাণ ও বয়সের সঠিক হিসাব রাখতে জাতীয় ডাটাবেজ তৈরি।
উৎপাদক ও আমদানিকারকের দায় (EPR): প্যানেল সরবরাহকারীদের নির্দিষ্ট মেয়াদ শেষে তা ফেরত নেওয়ার বাধ্যবাধকতা।
রিসাইক্লিং অবকাঠামো: সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বে (PPP) আধুনিক রিসাইক্লিং প্ল্যান্ট স্থাপন।
সৌরবিদ্যুৎকে পরিবেশবান্ধব রাখতে হলে শুধু নতুন প্যানেল স্থাপনই যথেষ্ট নয়, পুরোনো প্যানেলের পুনর্ব্যবহারও নিশ্চিত করতে হবে। ‘সোলার থেকে বিদ্যুৎ’ এবং ‘সোলার বর্জ্য থেকে সম্পদ’ – এই দুই ধারণাকে একসাথে এনে কাজ করলেই সৌরবিদ্যুতের সুফল টেকসই হবে বলেও জানিয়েছেন বাংলাদেশি প্রবাসী বিজ্ঞানী ড. মো. মোখলেছুর রহমান।