বাংলাদেশ বড় ধরনের ভূমিকম্পের ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে- এমন সতর্কতা দিয়েছেন অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নে অবস্থানরত প্রখ্যাত এনার্জি মেটেরিয়ালস সায়েন্টিস্ট ড. মো. মোখলেছুর রহমান, চিফ সায়েন্টিস্ট ও হেড অব R&D- LER। ড. মো. মোখলেছুর রহমান মনে করেন যে বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান ও ভূ-গঠনের কারণে বড় ধরনের ‘মেগাথ্রাস্ট’ ভূমিকম্প যে কোনো সময় ঘটতে পারে।
তিনি ব্যাখ্যা করে বলেন যে-পৃথিবীটা বেশ কয়েকটি স্তর দিয়ে তৈরী এবং পৃথিবীর প্রথম স্তর হলো লিথোস্ফিয়ার যা ভুপৃষ্ঠ থেকে ১০০ কিলোমিটার গভীর। পৃথিবীর এই স্তরটি অনেক গুলো ক্রাস্ট ব্লক বা স্ল্যাব দিয়ে তৈরী এবং এই প্রতিটি ক্রাস্ট ব্লক বা স্ল্যাব কে টেকটনিক প্লেট বলা হয়। এই স্তর টি মূলত সলিড পাথর, বালি, মাটি ও বিভিন্ন ধরণের হাইড্রোকার্বন (কার্বন, হাইড্রোজেন, অক্সিজেন) যৌগ দিয়ে তৈরী।
এই স্তরটির নিচে রয়েছে ‘আস্থানোস্ফিয়ার; যেখানে অত্যধিক তাপ ও চাপের কারণে বিভিন্ন পদার্থের (সিলিকেট, ম্যাগনেসিয়াম অক্সাইড, আইরন অক্সাইড, সিলিকন অক্সাইড, অলিভিন ও পাইরোজিন খনিজ) সেমি-সলিড মিশ্রণ ক্রমাগত নড়াচড়া করে।
অত্যধিক তাপ, চাপ ও সেমি-সলিড পদার্থের নড়াচড়াই উপরের প্লেটগুলোকে ধাক্কা দেয়, ফলে প্লেট গুলোর মধ্যে তিন ধরনের সংঘর্ষ হয়: ১. একটা প্লেট আর একটা প্লেট থেকে দূরে সরে যাই; ২. একটা প্লেট নিচে তলিয়ে যাই এবং উপরে আর একটা প্লেট উঠে আসে এবং ৩. পাশ বরাবর স্লাইড করে ।
বিশ্বমানের গবেষণা বলছে- বাংলাদেশ তিনটি টেকটনিক প্লেটের সংযোগস্থলে অবস্থিত: ইন্ডিয়ান প্লেট, ইউরেশিয়ান প্লেট ও মায়ানমার (বার্মিজ) প্লেট । এই প্লেটগুলোর সংঘর্ষে দেশের ভেতরে একাধিক ফল্ট জোন তৈরি হয়েছে। সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য: ডাউকি ফল্ট, যমুনা ফল্ট, বগুড়া ফল্ট, মধুপুর ফল্ট, হালুয়াঘাট ফল্ট ও সিলেট–চট্টগ্রাম–মায়ানমার ফল্ট । তিনি ধারণা করছেন এর বাইরেও দেশে আরও অনাবিষ্কৃত ফল্ট জোন রয়েছে।
সবচেয়ে ঝুঁকিতে সিলেট-চট্টগ্রাম সাবডাকশন জোন । নেচার জিওসায়েন্স জার্নালে ২০১৬ সালে প্রকাশিত গবেষণায় বাংলাদেশি জিওসায়েন্টিস্ট প্রফেসর ড. সৈয়দ হুমায়ুন আখতার দেখিয়েছেন যে দেশের বড় ভূমিকম্পের প্রধান উৎস দুটি- ডাউকি ফল্ট ও সিলেট-চট্টগ্রাম সাবডাকশন জোন।
এই সাবডাকশন এলাকায় ইন্ডিয়ান প্লেট বার্মা প্লেটের নিচে তলিয়ে যাচ্ছে। এখানে প্রায় ৮.২-৯.০ ম্যাগনিচ্যুড শক্তি জমা হয়ে আছে যা ইতোমধ্যে বৈজ্ঞানিকভাবে পরিমাপ করা হয়েছে। এই জোনে প্লেট দুটো লক হয়ে আছে যা যে কোনো সময় স্লিপ করে খুলে (unlock) যাবে, আর এটাই হলো সবচাইতে ভয়ের কারণ।
এই ধরণের সাবডাকশন জোন ভয়াবহ মাত্রার মেগাথ্রাস্ট ভূমিকম্প ঘটাতে সক্ষম। এর উদাহরণ- ১৯৬০ সালের চিলি ভূমিকম্প (৯.৫ ম্যাগনিচ্যুড) ও ২০১১ সালের জাপানের ভূমিকম্প (৯.১ ম্যাগনিচ্যুড)।
ক্রমাগত ছোট কম্পন বড় বিপদের পূর্বাভাস । সাম্প্রতিক সময়ে দেশে ছোট ছোট কম্পন বাড়ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন -এটি ইঙ্গিত দেয় যে প্লেটগুলোর ‘লকড জোন’ ভাঙতে শুরু করেছে। শত শত বছর ধরে জমা শক্তি বেরিয়ে আসার সময় খুব কাছেই।
ড. মোখলেছুর রহমান মনে করছেন- বড় ধরনের ভূমিকম্প আজ, কাল, দশ কিংবা পঞ্চাশ বছর পর-যে কোনো সময় হতে পারে, কিন্তু ঘটবেই। বাংলাদেশের ভূ-গঠনে ঝুঁকি আরও বেশি। বাংলাদেশের ভূমি মূলত হিমালয় থেকে আনা বালি, নুড়ি, কাদা ও নরম সেডিমেন্ট দিয়ে গঠিত- যা অত্যন্ত দুর্বল। সামান্য কম্পনেও বড় ভূমিধস ও অবকাঠামো ধসে পড়ার ঝুঁকি থাকে।
আর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক বাংলাদেশ পৃথিবীর অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ দেশ। যে কোনো বড় কম্পন দেশের প্রায় সব জেলাতেই তীব্র প্রভাব ফেলতে পারে। ড. মোখলেছুর রহমান সতর্ক করে বলেন বাংলাদেশ সরকারকে এখনই পরিকল্পনা নেওয়া জরুরি, যার মধ্যে থাকতে পারে- শক্তিশালী বিল্ডিং কোড বাস্তবায়ন; দুর্যোগ প্রস্তুতিমূলক প্রশিক্ষণ; জরুরি উদ্ধার সক্ষমতা বৃদ্ধি; ফল্ট জোনভিত্তিক বিশেষ ঝুঁকি মানচিত্র তৈরি এবং ভূমিকম্প পূর্বাভাস গবেষণায় বিনিয়োগ বৃদ্ধি ।
তিনি আরও বলেন, “ অদূর ভবিষ্যতে বড় ভূমিকম্প এড়ানো সম্ভব নয়, তবে সঠিক প্রস্তুতি প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি বহুগুণ কমাতে পারে।”